01/10/2026
আজ ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হৃদ্রোগের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ নিয়ে সচেতনতা তৈরিই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রচারণার বার্তা— ‘ডোন্ট মিস আ বিট’......
অর্থাৎ হৃদ্রোগের এমন কিছু লক্ষণ আছে, যেগুলোকে অবহেলা না করে সময়মতো গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের এবারের প্রচারণায় বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে, হৃদ্রোগ অনেক সময় নীরবেই এগিয়ে যেতে পারে।
হৃদ্রোগকে অনেকেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা মনে করেন। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হৃদ্রোগ ও রক্তনালির রোগ বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান কারণ। ২০২২ সালে এসব রোগে আনুমানিক ১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষ মারা যান, যা ওই বছরের মোট মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া বা স্ট্রোকের কারণে। আরও উদ্বেগের বিষয়, হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশের বেশি ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল স্ট্রোক ও ইস্কেমিক হৃদ্রোগ। ওই বছরে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে স্ট্রোকে মৃত্যুর হার ছিল ৮০ দশমিক ২ এবং ইস্কেমিক হৃদ্রোগে ৫৮ দশমিক ৫। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদ্রোগও মৃত্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে রয়েছে।
তবে হৃদ্রোগের বড় একটি অংশের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাবার, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ওজন এবং ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বায়ুদূষণও হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এসব ঝুঁকির সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং স্থূলতার মতো বিষয় যুক্ত হয়ে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়ায়।
সমস্যার একটি জায়গা হলো— হৃদ্রোগ সব সময় নাটকীয় কোনো সংকেত দিয়ে শুরু হয় না। কারও ক্ষেত্রে বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, ঘাম বা শরীরের অন্য অংশে অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে হৃদ্রোগের উপসর্গ সব সময় প্রচলিত বুকব্যথার মতো নাও হতে পারে। তাই নতুন বা অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গকে শুধু ক্লান্তি, গ্যাস বা বয়সের স্বাভাবিক সমস্যা ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
হৃদ্রোগ প্রতিরোধের শুরুটা আসলে দৈনন্দিন জীবন থেকেই। ধূমপান বন্ধ করা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, খাবারে লবণ ও অতিরিক্ত চর্বি কমানো, শাকসবজি ও ফলমূলসহ সুষম খাবার খাওয়া এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করা দরকার— বিশেষ করে যাদের পারিবারিক ইতিহাস বা অন্য কোনো ঝুঁকি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান বন্ধ, লবণ কমানো, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বিশ্ব হার্ট দিবসের ২০২৬ সালের প্রচারণায় দৈনন্দিন শারীরিক কর্মকাণ্ডকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব হার্ট ফেডারেশন সেপ্টেম্বরজুড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট নড়াচড়া বা শরীরচর্চার মাধ্যমে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়েছে। হাঁটা, সাইকেল চালানো, খেলাধুলা বা নাচ— যে কোনো ধরনের নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডই এর অংশ হতে পারে।
বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের সামগ্রিক বোঝাও বাড়ছে। ২০২৬ সালের জুনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, দেশের মোট মৃত্যুর প্রতি ১০টির মধ্যে প্রায় সাতটি অসংক্রামক রোগের কারণে হচ্ছে এবং এসব মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি অকালমৃত্যু। হৃদ্রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এই বোঝার বড় অংশ তৈরি করছে।
তাই বিশ্ব হার্ট দিবসের বার্তাটি কেবল একটি দিনের জন্য নয়। হৃদ্যন্ত্র আমাদের শরীরের এমন একটি অঙ্গ, যার কাজ আমরা সচরাচর টের পাই না যতক্ষণ না কোনো সমস্যা দেখা দেয়। সেই নীরবতার কারণেই সচেতনতা আরও জরুরি। বুকের অস্বস্তি, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট কিংবা অন্য কোনো নতুন উপসর্গকে অবহেলা না করা, ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে বড় বিপদ এড়ানোর প্রথম পদক্ষেপ।
কারণ হৃদ্যন্ত্রের প্রতিটি স্পন্দনই গুরুত্বপূর্ণ। আর কখন সেই স্পন্দন সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে— সেটি মিস না করাই এবারের বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল শিক্ষা।
কেএইচএম হার্ট সেন্টার:
ধানমন্ডি, ঢাকা।