27/05/2021
চলতি করোনা পরিস্থিতিতে "ব্ল্যাক ফাংগাস" বা "মিউকরমাইকোসিস" সম্পর্কে সবার মনেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মিউকরমাইকোসিস সম্পর্কে সকলের বোঝার জন্য কিছু আলোচনা করলাম। এতে কেউ সামান্য উপকৃত হলে ভালো লাগবে।
** মিউকর কি?
মিউকর একরকম ছত্রাক, যা পরিবেশে সর্বত্র আছে। বর্ষাকালে বাসী পাঁউরুটির ওপর যে কালো ছাতা পড়ে, সেটিই মিউকর বা চলতি কথায় "ব্ল্যাক ফাংগাস"
সাধারণত মিউকর মানুষের রোগ সৃষ্টি করে না। কিন্তু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যধিক হ্রাস পেলে মিউকর শরীরে বাসা বাঁধে। একেই "মিউকরমাইকোসিস" বলে।
** মিউকরমাইকোসিস কোনো নতুন অসুখ নয়। করোনা মহামারী আসার আগেও বিভিন্ন কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া রোগী যেমন - অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের রোগী বা ক্যান্সারের রোগীদের মধ্যে মিউকরমাইকোসিস দেখা গেছে।
** হঠাৎ করে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় মিউকরমাইকোসিসের আক্রান্তদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। করোনা থেকে সেরে উঠলেও মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত হলে রোগীর চোখ চিরকালের মতো নষ্ট হয়ে যেতে পারে অথবা মৃত্যু ঘটতে পারে।
** করোনা সংক্রমণের সময় অথবা সেরে ওঠার পর এক দুই সপ্তাহের মধ্যে মিউকরমাইকোসিসের সংক্রমণের ঘটনা ঘটতে পারে।
** কেন করোনা মহামারীর সময় হঠাৎ করে মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেড়ে গেল?
√ করোনা সংক্রমণ হলে ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তের সুগার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে এবং যেসব রোগীদের আগে থেকে সুগার ছিল না, তাঁদেরও ডায়াবেটিস ধরা পড়ছে।
√ কোভিড সংক্রমণের জন্য শরীরে কিছু বিশেষ প্রকারের শ্বেত কণিকার সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে, ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
√ কোভিডের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ এবং tocilizumab শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
√ রোগীর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মান মিউকরমাইকোসিস অসুখের বিপজ্জনকতার সঙ্গে ব্যস্তানুপাতিক। অর্থাৎ, রোগী যদি ডায়াবেটিক হন, আগে থেকেই যদি তাঁর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, এবং কোভিড সংক্রমণের জন্য তাঁকে স্টেরয়েড জাতীয় ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়, তবে তাঁর মিউকরমাইকোসিস হলে সেই সংক্রমণ অধিক ভয়াবহ হবে।
এবার, মিউকরমাইকোসিসের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে আলোচনা করছি।
করোনা পরিস্থিতিতে যে মিউকরমাইকোসিসের আধিক্য দেখা যাচ্ছে সেটি হচ্ছে "রাইনোসেরিব্রোঅরবিটাল মিউকর মাইকোসিস"। "রাইনো" মানে নাক এবং "সেরিব্রাল" মানে মস্তিষ্ক, "অরবিট" মানে অক্ষিকোটর। এই প্রকার মিউকরমাইকোসিস নাক থেকে মস্তিষ্ক এবং অক্ষিকোটরে ছড়িয়ে পড়ছে।
১) প্রাথমিক অবস্থায় অসুখটি নাক এবং তৎসংলগ্ন সাইনাসগুলিতে আক্রমণ করছে। এই অবস্থায় রোগটি তাড়াতাড়ি ধরা পড়লে রোগ থেকে মুক্তি সম্ভব এবং জটিলতা এড়ানো যেতে পারে।
প্রাথমিক অবস্থায় রোগটির উপসর্গগুলি হলো-
::: মাথা ব্যথা ও নাক বন্ধ হওয়া। বিশেষ করে, মাথা ব্যথা যদি একটানা হয় এবং ব্যথার ওষুধেও না কমে।
::: নাক থেকে বাদামী বা রক্তের রঙের শ্লেষ্মা বার হওয়া বা নাকের মধ্যে বাদামী রঙের শুকনো শ্লেষ্মা ( ক্রাস্ট) জমা হওয়া
::: মুখের ত্বক অসাড় হয়ে যাওয়া এবং ব্যথার অনুভূতি নষ্ট হয়ে যাওয়া
::: মুখের চামড়ার রঙের পরিবর্তন অথবা মুখ ফোলা ফোলা লাগা
::: দাঁত আলগা হয়ে যাওয়া অথবা তালুতে (টাকরায়) ঘা হওয়া
২) মিউকরমাইকোসিস যদি অক্ষিকোটরে বা অরবিটে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বলা যেতে পারে, রোগটি আরো বেড়ে গেছে ( মডারেট)
অক্ষিকোটরে মিউকরমাইকোসিস ছড়িয়ে পড়ার উপসর্গগুলি হলো-
:::চোখ ব্যথা
::: চোখ ফুলে যাওয়া
::: চোখ লাল হওয়া
::: চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যাওয়া
::: চোখে দুটি করে ইমেজ দেখা (ডাবল ভিশন)
::: চোখে দেখতে না পাওয়া
এই অবস্থা হলে কি কি করবেন না?
~ নিজে থেকে কোনো ওষুধ প্রয়োগ করবেন না
~ রোগের লক্ষণগুলি অবহেলা করবেন না
~ চিকিৎসকের নির্দেশ অমান্য করবেন না
মিউকরমাইকোসিসের উপসর্গ দেখা দিলে কি করবেন?
~ আগে থেকেই ডাক্তারকে জানান, আপনার ডায়াবেটিস আছে কিনা
~ নিয়মিত ব্লাড সুগার মাপুন
~ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন
~ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
~ চিকিৎসকের নির্দেশ পালন করুন
পরিশেষে সকলের কাছে আবেদন, অযথা আতঙ্কিত হবেন না ও গুজব ছড়াবেন না।
মনে রাখবেন, মনের সঙ্গে কিন্তু শরীরের যোগাযোগ আছে।
লেখা © ডাঃ প্রাপ্তি ঘোষ
ছবিগুলি বিভিন্ন চিকিৎসকদের থেকে সংগৃহীত