21/09/2026
মাম্পস নিয়ে বাবা-মায়েদের আতঙ্কিত হওয়ার আগে কিছু কথা জানা দরকার। গত সপ্তাহে চেম্বারে একজন মা এসেছিলেন, ছেলের গাল ফুলে গেছে দেখে রীতিমতো কাঁদছিলেন — ভেবেছিলেন কি না কি! আসলে সেটা ছিল মাম্পস। এ বিষয়ে আজ বিস্তারিত লিখছি।
😷 মাম্পস কী?
মাম্পস একটি ভাইরাসজনিত রোগ, ভাইরাস প্যারোটিড গ্রন্থি (কানের নিচে-সামনে অবস্থিত লালাগ্রন্থি) কে আক্রান্ত করলে প্যারোটিড গ্রন্থি ফুলে গিয়ে মাম্পস রোগ দেখা দেয়। হাম কমে যাওয়ার পর এখন দেশে দ্বিতীয় সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া ভাইরাল রোগ হিসেবে উঠে আসছে এই মাম্পস। টিকাবিহীন বা অসম্পূর্ণ টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
🔍 লক্ষণগুলো কী কী?
শুরুতে অন্যান্য সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতোই লাগে। তারপর আসল লক্ষণগুলো ফুটে ওঠে —
- এক বা দুই পাশের গাল/কানের নিচে ব্যথাসহ ফোলাভাব (এটাই মূল চিহ্ন)
- জ্বর, সাধারণত মাঝারি মাত্রার
- খাবার চিবাতে বা গিলতে ব্যথা, বিশেষত টক জাতীয় খাবারে
- মাথাব্যথা, শরীর ম্যাজম্যাজ ভাব
- ক্ষুধামান্দ্য, ক্লান্তি
- কানের ব্যথা
ফোলাটা প্রথমে এক পাশে শুরু হয়ে ১-৩ দিনের মধ্যে অন্য পাশেও ছড়াতে পারে। অনেক বাবা-মা প্রথম দেখায় দাঁতের সমস্যা বা লিম্ফ নোড ইনফেকশন ভেবে ভুল করেন — আমার কাছে এমন রোগী আগেও এসেছে।
🏠 মাম্পস হলে বাড়িতে কী করবেন এখন
- বিশ্রাম দিন, শিশুকে স্কুলে বা বাইরে পাঠাবেন না (সংক্রামক রোগ, ছড়ায়)
- জ্বর বা ব্যথার জন্য বয়স ও ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল — ডোজ চিকিৎসকের পরামর্শ মতোই দিন, নিজে থেকে ওষুধের মাত্রা বাড়াবেন না
- নরম, তরল বা আধা-তরল খাবার দিন। টক ফল, আচার এড়িয়ে চলুন — এতে লালাগ্রন্থিতে ব্যথা বাড়ে
- পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাওয়াতে থাকুন
- ফোলা জায়গায় হালকা গরম সেঁক আরাম দিতে পারে
- পরিবারের অন্য সদস্য, বিশেষ করে টিকাবিহীন শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করুন
⚠️ মাম্পস হলে কোন লক্ষণগুলো ঝুঁকিপূর্ণ এবং কেন
মাম্পস সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়। কিন্তু কিছু জটিলতা আছে যা গুরুত্ব সহকারে দেখা দরকার —
- তীব্র মাথাব্যথা সাথে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া — মেনিনজাইটিসের আশঙ্কা, ভাইরাসটি মস্তিষ্কের আবরণেও আক্রমণ করতে পারে
- বারবার বমি — মস্তিষ্কে প্রদাহের ইঙ্গিত হতে পারে
- খিঁচুনি বা অতিরিক্ত ঝিমুনি — এনকেফালাইটিসের লক্ষণ, এটি জরুরি অবস্থা
- বয়ঃসন্ধি পার হওয়া ছেলেদের ক্ষেত্রে অণ্ডকোষে ব্যথা ও ফোলা (অর্কাইটিস) — ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তাই দ্রুত দেখানো জরুরি
- পেটের উপরের দিকে তীব্র ব্যথা — অগ্ন্যাশয়ে (প্যানক্রিয়াস) প্রদাহের সম্ভাবনা
- শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া বা এক কানে হঠাৎ কম শোনা — মাম্পস স্থায়ী বধিরতার একটি পরিচিত কারণ, খুব কম ক্ষেত্রে হলেও উপেক্ষা করার মতো নয়
🚩 রেড ফ্ল্যাগ — এই লক্ষণ হলে দেরি না করে শিশুকে হাসপাতালে নিন
- খিঁচুনি
- চেতনা কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ঘুম-ঘুম ভাব
- ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, আলোতে চোখ জ্বালা
- তীব্র পেটে ব্যথাসহ বমি
- অণ্ডকোষে হঠাৎ তীব্র ব্যথা-ফোলা
- হঠাৎ শোনার সমস্যা
- খুব উচ্চ জ্বর যা ওষুধেও নামছে না
শেষ কথাটা বলি — মাম্পস প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। MMR টিকা এখানে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। যেসব শিশুর টিকা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, তাদের সময়মতো টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে উপরের নিয়মগুলো মেনে চলুন, আর রেড ফ্ল্যাগ দেখলে দেরি করবেন না।
#মাম্পস #শিশুস্বাস্থ্য #মাম্পসপ্রতিরোধ #এমএমআরটিকা