16/10/2026
বঙ্গভঙ্গ অত্যাচারী হিন্দু জমিদারদের দ্বারা নিপীড়নের শিকার পূর্ববঙ্গের অবহেলিত জনগণের মনে স্বায়ত্তশাসনের চেতনা জাগিয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ ছিল পূর্ববঙ্গের অবহেলিত মানুষের মনে স্বাধিকারের চেতনা ও রাজনৈতিক স্বতন্ত্রতার বীজ বপনকারী একটি প্রাথমিক অনুঘটক।
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। যার ফলে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিভাগ ও আসাম নিয়ে গঠিত হয় "পূর্ববঙ্গ ও আসাম" নামে একটি নতুন প্রদেশ, যার রাজধানী করা হয় ঢাকাকে। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত হয় "পশ্চিমবঙ্গ" প্রদেশ, যার রাজধানী ছিল কলকাতা।
বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানী হওয়ায় এবং নতুন সুযোগ-সুবিধা তৈরি হওয়ায় পূর্ববঙ্গের জনগণ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। এটিকে তারা কলকাতার জমিদার ও পুঁজিপতিদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণ থেকে মুক্তির একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
প্রায় পৌনে দু’শ বছরের ব্যবধানে ঢাকা আবারো প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা লাভ করায় রিক্ত পূর্ববঙ্গ আবার নতুন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ পেল। সমগ্র উপমহাদেশের ন্যায় বাংলার পূর্বাঞ্চলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসাধারণ ছিল অনগ্রসর, ইঙ্গ-হিন্দু শোষণ আর জুলুমে নিষ্পেষিত তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক।
উইলিয়াম হান্টার তাই তাঁর বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- “খুব কম সরকারি অফিস আছে, যেখানে মুসলমানরা দারোয়ান, সংবাদবাহক, দোয়াত সংরক্ষক নয়তোবা কলম মেরামতকারীর ঊর্ধ্বে কোন পদ আশা করতে পারে.......”।
হিন্দু জমিদারগণ এ অঞ্চলের প্রজাদের শোষণ করে সে শোষণলব্ধ অর্থ কলকাতায় বসে বিলাসিতায় উড়াতেন। প্রজাদের শিক্ষা-দীক্ষা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং নানাবিধ মৌলিক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে তারা ছিলেন চরম উদাসীন। এককথায় বঙ্গ বিভাগের আগে ঢাকাকেন্দ্রিক পূর্ববঙ্গ ছিল কলকতাকেন্দ্রিক তথাকথিত প্রগতি বঙ্গের ‘লুণ্ঠন ক্ষেত্র’। পূর্বের কাঁচামালে পশ্চিমে গড়ে উঠেছিল শিল্প-কারখানা, পূর্ব বাংলাকে লুণ্ঠন করে পশ্চিম বাংলায় এনেছিল রেনেসাঁ, সেখানে গড়ে তোলা হয়েছিল স্কুল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-হাসপাতাল। ফলে বাঙালি মুসলিম সমাজ বঙ্গভঙ্গকে তাদের বঞ্চনার অবসানের সূচনা হিসেবেই দেখেছিল। বঙ্গবিভাগের ফলে মুসলিম সমাজে যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো- মুসলমানরা অধিকার সচেতন হয়ে ওঠেন।
ফলে ঢাকা কেন্দ্রিক বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটে, যারা পরবর্তীকালে জাতীয়ভাবে অবদান রাখতে সক্ষম হন। বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনকে ত্বরান্বিত করেছিল। ফলে ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন শেষে ‘অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ নামে একটি অভিন্ন প্লাটফর্মে মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯০৫-১৯১১ মেয়াদে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এ অঞ্চলে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। বঙ্গভঙ্গের পর মাত্র পাঁচ বছরে মুসলিম ছাত্রের সংখ্যা ৩৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছিল। শিক্ষায় জাগরণের ফলে সরকারি চাকরিতে মুসলমানরগণ দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। এ ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সচেষ্ট হয়।
১৯০৯ সালে স্বতন্ত্র নির্বাচনের অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়েই গঠিত হয় ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম ব্যবস্থাপক পরিষদ’ এভাবে সকল ক্ষেত্রে মুসলমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো বঙ্গভঙ্গ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ মুসলিম সমাজে এমন গভীর রেখাপাত করে যার ফলশ্রুতিতে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়। বিশেষত প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের যে চরম সাম্প্রদায়িক ও বীভৎস রূপ তারা প্রত্যক্ষ তার ফলে তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র জাতিসত্তার চেতনা বদ্ধমূল হয়।
#বঙ্গভঙ্গ #বাংলাদেশ #ইতিহাস #মুসলিম