23/09/2026
আজকে না, কালকেও হয়তো না, কিন্তু একদিন হঠাৎ বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ধড়ফড়ানি টের পাবেন - আর তখনই প্রশ্ন জাগবে, "এটা কী হলো?"
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। মাস ছয়েক আগে হঠাৎ রাতে ঘুমের মধ্যে বুকের ভেতর একটা অস্বাভাবিক অনুভূতি হলো - যেন হৃদপিণ্ড ঠিকমতো তাল মিলিয়ে চলছে না, কখনো দ্রুত, কখনো এলোমেলো। প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো বেশি চা খাওয়ার কারণে হচ্ছে, বা রাত জাগার প্রভাব।
পরদিন সকালেও একই অনুভূতি হলো, সঙ্গে সামান্য মাথা ঘোরা। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম ডাক্তার দেখাবো। ইসিজি করার পর ডাক্তার যা বললেন, তা শুনে আমি নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।
আমার হৃদস্পন্দনের ছন্দটাই ঠিক ছিল না - একে বলে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন।
অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন (Atrial Fibrillation বা AFib) হলো হৃৎপিণ্ডের একটি অনিয়মিত ও দ্রুত ছন্দজনিত সমস্যা বা অ্যারিথমিয়া।
এই রোগে হৃৎপিণ্ডের উপরের কক্ষগুলো (অ্যাট্রিয়া) নিয়মিতভাবে সংকুচিত না হয়ে বিশৃঙ্খলভাবে কাঁপতে থাকে। ফলে শরীরের ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে সমস্যা হয়।
লক্ষণ :
হৃদস্পন্দন খুব দ্রুত বা অনিয়মিত হওয়া,
বুক ধড়ফড় করা
অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা,
শ্বাসকষ্ট হওয়া,
মাথা ঘোরানো বা হালকা মাথা অনুভূত হওয়া,
বুকে অস্বস্তি বা ব্যথা
কারণ :
উচ্চ রক্ত চাপ, বয়স বৃদ্ধি, আগের হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ, ভাল্বের সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা (অতিরিক্ত সক্রিয় থাইরয়েড), অতিরিক্ত মদ্যপান, বংশগত কারণ বা স্থূলতা
জটিলতা : রক্ত জমাট বাঁধা, স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া, হার্ট ফেইলিউর বা হৃদ্বৈকল্য
চলুন সহজ ভাষায় বুঝি, এটা আসলে কী।
স্বাভাবিকভাবে আমাদের হৃদপিণ্ড একটা নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক সংকেত অনুসরণ করে নিয়মিত ছন্দে স্পন্দিত হয়। অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনে হৃদপিণ্ডের ওপরের অংশের (এট্রিয়া) বৈদ্যুতিক সংকেত এলোমেলো হয়ে যায়, ফলে হৃদপিণ্ড অনিয়মিত ও অনেক সময় দ্রুত গতিতে স্পন্দিত হতে থাকে। এতে রক্ত সঠিকভাবে পাম্প না হয়ে হৃদপিণ্ডের ভেতরে কিছুটা জমে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এই সমস্যা হওয়ার পেছনে কয়েকটা বড় কারণ থাকতে পারে -
১. দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ, যা হৃদপিণ্ডের গঠনে পরিবর্তন আনতে পারে।
২. বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক সিস্টেমে স্বাভাবিক পরিবর্তন - যদিও তরুণদের মধ্যেও এটা দেখা যেতে পারে, বিশেষত অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা ঘুমের সমস্যা থাকলে।
৩. থাইরয়েডের সমস্যা, বিশেষত অতিরিক্ত সক্রিয় থাইরয়েড, যা হৃদস্পন্দনে প্রভাব ফেলতে পারে।
৪. অতিরিক্ত ক্যাফেইন, অ্যালকোহল বা দীর্ঘদিনের অনিদ্রা - আমার ক্ষেত্রে যেমন কাজের চাপে ঘুম কম হচ্ছিল, সঙ্গে চা-কফির পরিমাণও বেড়ে গিয়েছিল।
মানুষ সাধারণত যে লক্ষণগুলো অবহেলা করে - মাঝেমধ্যে বুকে ধড়ফড়ানি, হালকা মাথা ঘোরা, সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়া, বা হঠাৎ শ্বাস নিতে একটু কষ্ট হওয়া। এগুলোকে অনেকেই "গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা" বা "দুশ্চিন্তা" বলে এড়িয়ে যান, যেমনটা আমিও প্রথমে ভেবেছিলাম।
এখনো সময় আছে বলার কারণ - সময়মতো ধরা পড়লে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে, এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।
WHO ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গাইডলাইন অনুযায়ী কিছু বাস্তবসম্মত করণীয় -
১. বুকে ধড়ফড়ানি বা অনিয়মিত স্পন্দন বারবার অনুভব করলে, ইসিজি করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া - কারণ এই ধরনের ছন্দের সমস্যা নিজে থেকে বোঝা যায় না।
২. ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল গ্রহণ কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, যা হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করতে পারে।
৩. উচ্চ রক্তচাপ বা থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে, তা নিয়মিত পরীক্ষা করিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা - কারণ এই সমস্যাগুলো হৃদস্পন্দনের ছন্দের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে।
একটা জরুরি কথা - হঠাৎ তীব্র বুকে ব্যথা, প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট, শরীরের একপাশ অবশ হয়ে যাওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত জরুরি বিভাগে যাওয়া উচিত।
নিজেকে একবার প্রশ্ন করেন তো - বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত ধড়ফড়ানি হলে, আপনি কি সেটাকে গুরুত্ব দেন, নাকি এড়িয়ে যান?
আপনার কি কখনো এমন অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের অভিজ্ঞতা হয়েছে?
রোগ নির্ণয় :
অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন (আফিব) নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসা ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন পরীক্ষার সমন্বয় জড়িত।
হতে পারে:
১. ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি বা ইকেজি):
অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন ইসিজি হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিমাপ করে, তাল দেখায় এবং কত দ্রুত হৃদস্পন্দন করছে।
২. রক্ত পরীক্ষা: তারা এমন অবস্থার জন্য পরীক্ষা করে যা হৃদয়কে প্রভাবিত করতে পারে বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের কারণ হতে পারে, যেমন থাইরয়েড রোগ (Hormone panel test : T3, FT3, FT4, TSH) এবং লিভার ফাংশন টেষ্ট (LFT) এবং কিডনি ফাংশন টেষ্ট (KFT) করে দেখা যে কতটা ভালো আছে।
৩. ইকোকার্ডিওগ্রাম: তারা হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের চিত্র তৈরি করতে শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে, দেখায় যে কীভাবে রক্ত হৃদপিণ্ড এবং ভালভের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনের জন্য চিকিত্সা :
অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনের চিকিৎসায় হৃৎপিণ্ডের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ, রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ এবং অন্তর্নিহিত অবস্থার ব্যবস্থাপনার পদ্ধতির সংমিশ্রণ জড়িত। এই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে:
মেডিকেশন: ব্লাড থিনার হৃদপিণ্ডে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করতে ডাক্তাররা ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার বা বিটা-ব্লকার লিখে দিতে পারেন।
কার্ডিওভারসন: এটি এমন একটি পদ্ধতি যা হৃৎপিণ্ডের ছন্দ পুনরায় সেট করতে বৈদ্যুতিক শক বা ওষুধ ব্যবহার করে।
ক্যাথেটার অ্যাবলেশন: যারা ওষুধের প্রতি ভালোভাবে সাড়া দেয় না তাদের জন্য চিকিৎসকরা ক্যাথেটার অ্যাবলেশনের সুপারিশ করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে হৃদয়ের টিস্যুতে ছোট ছোট দাগ তৈরি করা জড়িত। এই দাগগুলি অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক সংকেতগুলিকে ব্যাহত করে, যার ফলে অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন হয়।
উন্নত অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন চিকিত্সা:
এর মধ্যে রয়েছে গোলকধাঁধা পদ্ধতি, যা অনিয়মিত ছন্দ নিয়ন্ত্রণের জন্য হৃদপিণ্ডে দাগের একটি কাঠামো তৈরি করে, অথবা হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণের জন্য পেসমেকার বসানো।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
আপনি নীচের উল্লিখিত পরিবর্তনগুলির মধ্যে কোনটি লক্ষ্য করলে অবিলম্বে চিকিৎসা নির্দেশিকা সন্ধান করুন:
আপনি যদি আপনার হার্টের ছন্দে হঠাৎ পরিবর্তন অনুভব করেন
আপনি যদি অভিজ্ঞতা হয় মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট
আপনার যদি বুকে ব্যথা থাকে যা আসে এবং যায়, এমনকি যদি এটি দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়
আপনি যদি হঠাৎ বুকের টান বা ব্যথা অনুভব করেন যা আপনার কাঁধ, বাহু, ঘাড়, চোয়াল বা পিছনে ছড়িয়ে পড়ে