20/10/2026
# # # 📖 প্রতি বৃহস্পতিবারের মেহমান
# # # পর্ব ৩: কবরস্থানের সেই শিশুটি
“ভাইয়া, এত বছর ধরে তুমি আমার খাবার খেয়েছ। এবার আমার সঙ্গে বাড়ি চলো।”
কথাটা শোনার পর আমার মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ এক মুহূর্তে থেমে গেছে।
কবরস্থানের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বয়স পাঁচ কি ছয় বছর হবে। পরনে ময়লা সাদা জামা। মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। অথচ সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তার চোখ দুটো অবিকল আমার মতো।
আমি কাঁপা গলায় আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আম্মা, ও কে?”
আম্মা কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু আমার হাত ধরে ঘরের ভেতরে টেনে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর ছিটকিনি লাগিয়ে মেঝেতে বসে পড়লেন।
আমি বললাম, “আম্মা, এবার সব খুলে বলো। আর কিছু লুকাবে না।”
আম্মা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলতে শুরু করলেন।
“তোর জন্মের আগের বছর আমার একটা ছেলে হয়েছিল। নাম রেখেছিলাম আরমান। কিন্তু জন্মের সাত দিনের মাথায় ছেলেটা মারা যায়। তোর আব্বা নিজ হাতে তাকে আমাদের বাড়ির পেছনের কবরস্থানে দাফন করেছিলেন।”
আমি বললাম, “কিন্তু তুমি তো বললে, জন্মের পর কয়েক মিনিট বেঁচেছিল!”
আম্মা মাথা নিচু করলেন।
“আমি তোকে মিথ্যা বলেছি। আসলে আরমান সাত দিন বেঁচেছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তোর আব্বা এমন কিছু করতে শুরু করেন, যা আমি কোনোদিন বুঝতে পারিনি।”
“কী করতে শুরু করেছিলেন?”
“প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে কবরস্থানে যেতেন। ফিরে এসে বলতেন, ছেলেটা নাকি তাঁর স্বপ্নে আসে। খাবার চায়। প্রথমে আমি বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এক বৃহস্পতিবার রাতে তোর আব্বা ফিরে এসে বললেন, আরমান শুধু খাবার চায় না, সে নাকি তার ভাইয়ের জন্যও অপেক্ষা করছে।”
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“কিন্তু আমার তো জন্মই হয়নি তখন!”
আম্মা আমার দিকে তাকালেন।
“সেটাই তো বুঝতে পারিনি, বাবা। তোর জন্ম হয়েছিল তার পরের বছর। আর তুই জন্মানোর পর থেকেই তোর আব্বা ভয় পেতে শুরু করেন।”
“কেন?”
আম্মা কাঁপা গলায় বললেন, “কারণ তোর জন্মের রাতে সেই অচেনা লোকটা এসেছিল। সে তোর আব্বাকে বলেছিল, মৃত ছেলেটার সঙ্গে তার ভাইয়ের একটা সম্পর্ক আছে। আঠারো বছর পূর্ণ হলে সেই সম্পর্কের হিসাব মেটাতে হবে।”
আমি অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইলাম।
“তাহলে আব্বা আমার জীবন নিয়ে চুক্তি করেছিলেন?”
“না, বাবা! তোর আব্বা কখনো তোকে দিতে চাননি। তিনি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন চুক্তিটা ভাঙার।”
“কীভাবে?”
আম্মা উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে একটা শব্দ এল।
টক। টক। টক।
পেছনের দরজায় আবার তিনবার টোকা পড়েছে।
আমরা দুজনেই জমে গেলাম।
বাইরে থেকে সেই পরিচিত গলা শোনা গেল।
“মোবারক সাহেবের স্ত্রী, ছেলেটাকে নিয়ে বেরিয়ে আসুন। আজ আমাদের কথা শেষ করা দরকার।”
আম্মা আমার মুখ চেপে ধরলেন।
কিন্তু এবার লোকটা দরজায় দাঁড়িয়ে শুধু কথা বলছিল না। দরজার নিচ দিয়ে ধীরে ধীরে কালচে একটা তরল ঘরের ভেতরে ঢুকতে শুরু করল।
আমি ভয়ে পিছিয়ে গেলাম।
লোকটা বলল, “আপনার স্বামী আমাদের সঙ্গে যে চুক্তি করেছিলেন, সেটা তাঁর নিজের ইচ্ছায় হয়েছিল। তিনি আমাদের কাছ থেকে এমন একটা জিনিস চেয়েছিলেন, যা সাধারণ মানুষের ভাগ্যে থাকে না।”
আমার মাথায় একটা প্রশ্ন এল।
আমি দরজার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আব্বা তোমাদের কাছ থেকে কী চেয়েছিলেন?”
বাইরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর লোকটা উত্তর দিল।
“মৃত ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে।”
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
লোকটা আবার বলল, “তোমার আব্বা তাঁর প্রথম সন্তানকে হারানোর পর আমাদের কাছে এসেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, ছেলেটা যেন আবার ফিরে আসে। আমরা তাঁকে সুযোগ দিয়েছিলাম। বিনিময়ে শর্ত ছিল, তাঁর পরবর্তী সন্তান আঠারো বছর পূর্ণ হলে তাকে আমাদের কাছে আসতে হবে।”
আমি ফিসফিস করে বললাম, “তাহলে আরমানকে ফিরিয়ে আনার জন্য আব্বা আমাকে দিয়ে দিয়েছিলেন?”
লোকটা হেসে বলল, “তোমার আব্বা ভেবেছিলেন, আঠারো বছর অনেক দূরের কথা। এর মধ্যে হয়তো কোনো উপায় বের করতে পারবেন। কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না।”
আম্মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “কিন্তু আরমান তো ফিরে আসেনি! তোমরা কথা রাখোনি!”
বাইরের লোকটা এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
“সে ফিরে এসেছে। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে সে এই বাড়িতে আসে। আপনারা যে খাবার রেখে দেন, সে-ই খায়। কিন্তু আপনারা কখনো তাকে চিনতে পারেননি।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “তাহলে আজ খাবারটা পড়ে আছে কেন?”
লোকটা উত্তর দিল, “কারণ আজ সে আর খাবার খেতে আসেনি। আজ সে তার ভাইকে নিতে এসেছে।”
ঠিক তখনই ঘরের জানালায় একটা ছোট্ট হাত দেখা গেল।
সেই হাতের আঙুলগুলো কাচের ওপর ধীরে ধীরে আঁচড় কাটতে লাগল।
আমি জানালার দিকে তাকিয়ে দেখি, বাইরে সেই ছোট্ট ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে।
সে কাচের ওপাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
তারপর ঠোঁট নাড়ল।
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, সে বলছে—
“ভাইয়া, আব্বা তোমাকে সব বলেননি।”
আমার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে গেল।
আমি জানালার কাছে এগিয়ে যেতে চাইলে আম্মা আমাকে আটকে দিলেন।
“ওর দিকে তাকাস না! ও যা-ই বলুক, বিশ্বাস করিস না!”
আমি বললাম, “কিন্তু আম্মা, ও তো আমার ভাই!”
আম্মা চোখ বন্ধ করে কাঁদতে লাগলেন।
“ও আমার ছেলে ছিল, বাবা। কিন্তু ও আর আগের সেই আরমান নেই।”
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা এবার জোরে হেসে উঠল।
“সত্যিটা বলুন, মোবারক সাহেবের স্ত্রী। ছেলেটাকে আর কত দিন অন্ধকারে রাখবেন?”
আম্মা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
আমি তাঁর হাত ধরে বললাম, “কোথায় যাচ্ছ?”
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ আর কোনো মিথ্যা নয়।”
তারপর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বললেন, “আমি জানি, তোমরা কেন এসেছ। কিন্তু একটা কথা তোমরা জানো না।”
বাইরের লোকটা চুপ করে গেল।
আম্মা বললেন, “মোবারক তাঁর প্রথম সন্তানকে ফেরত চেয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু দ্বিতীয় সন্তান জন্মানোর পর তিনি চুক্তিটা ভাঙার একটা উপায় খুঁজে পেয়েছিলেন।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
বাইরের লোকটা ধীরে ধীরে বলল, “কী উপায়?”
আম্মা আমার হাত শক্ত করে ধরে বললেন—
“যে সন্তানকে তোমরা নিতে এসেছ, সে মোবারক সাহেবের রক্তের উত্তরাধিকারী নয়।”
আমি হতবাক হয়ে গেলাম।
“আম্মা! তুমি কী বলছ?”
আম্মা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই আমার পেটের সন্তান, বাবা। কিন্তু তোর জন্মের রাতে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তোর আব্বা তোকে কোথা থেকে পেয়েছিলেন, সেটা আমি কোনোদিন জানতে পারিনি।”
আমার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
“তার মানে আমি তোমাদের নিজের সন্তান নই?”
আম্মা কেঁদে বললেন, “আমি তোকে নিজের সন্তানের মতোই বড় করেছি। কিন্তু তোর আব্বা শেষ রাতে আমাকে বলেছিলেন, তোর জন্মের সত্যিটা একদিন প্রকাশ পাবে।”
বাইরে তখন সম্পূর্ণ নীরবতা।
কিছুক্ষণ পর লোকটা বলল, “তাহলে মোবারক সাহেব আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন!”
তার কণ্ঠে এবার রাগ স্পষ্ট।
“তিনি আমাদের যে সন্তান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই ছেলে সে নয়। কিন্তু এই ছেলের শরীরে যে রক্ত বইছে, তার সঙ্গে আমাদের পুরোনো হিসাব জড়িয়ে আছে।”
আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমার জীবনের কোন অংশটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা।
ঠিক তখনই দরজার নিচ দিয়ে একটা পুরোনো ছবি ঢুকে এল।
ছবিটা তুলে দেখি, সেখানে একজন অচেনা পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর কোলে একটা নবজাতক শিশু। পাশে আরেকজন লোকের মুখ কালো কালি দিয়ে মুছে দেওয়া।
ছবির পেছনে লেখা—
“যে শিশুকে কবর থেকে তুলে আনা হয়েছিল, তার আঠারো বছর পূর্ণ হলে তাকে তার আসল পরিচয় ফিরিয়ে দিতে হবে।”
আমি লেখাটা পড়ে আম্মার দিকে তাকালাম।
আম্মা ফিসফিস করে বললেন, “আল্লাহ! তাহলে তোর আব্বা সত্যিই সেই কাজ করেছিলেন!”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কোন কাজ?”
আম্মা উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে সেই ছোট্ট ছেলেটার কান্না শোনা গেল।
“ভাইয়া, তুমি জানো না তুমি কে। তুমি যদি বৃহস্পতিবার রাতে কবরস্থানে না আসো, তাহলে শুধু তোমার নয়, আমাদের সবার সর্বনাশ হবে।”
দূরে মসজিদের ঘড়িতে রাত একটা বাজার শব্দ হলো।
তারপর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা শেষবারের মতো বলল—
“আগামী বৃহস্পতিবার তোমার আঠারো বছর পূর্ণ হবে। সেদিন তুমি জানতে পারবে, তোমার জন্ম হয়েছিল কি না... নাকি তোমাকে কবর থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।”
সব শব্দ থেমে গেল।
আমি ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়লাম।
আমার সামনে তখন মাত্র সাত দিনের সময়।
আর সেই সাত দিনের মধ্যে আমাকে খুঁজে বের করতে হবে আমার আসল পরিচয়।
কিন্তু একটা প্রশ্ন আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল।
যদি আমি সত্যিই কবর থেকে ফিরে আসা কোনো শিশু হই, তাহলে এত বছর ধরে আমার সঙ্গে একই ঘরে থাকা আম্মা কি জানতেন, তাঁর নিজের ছেলের জায়গায় অন্য কেউ বড় হচ্ছে?
চলবে...