25/10/2026
আজ সকালে বসে মোবাইলে কোরআন পড়ছিলাম। পড়ছিলাম সূরা তাকাসুর। প্রথম দুটি আয়াত পড়েই আমি রীতিমতো ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম!
আল্লাহ বলছেন,
"অধিক পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপস্থিত হও।"
(সূরা আত-তাকাসুর: ১-২)
আয়াত দুটি পড়ে আমার মাথা কিছুক্ষণের জন্য পুরোপুরি ব্ল্যাংক হয়ে গিয়েছিল।
আমি আয়াতটির আরবি শব্দগুলো আবার দেখলাম: "হাত্তা যুরতুমুল মাক্বাবির" (حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ)।
এখানে আল্লাহ 'যুরতুম' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। 'যুরতুম' শব্দটি 'যিয়ারত' বা পরিদর্শনের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
আমার মাইন্ড ব্লো হয়ে গেল ঠিক এই জায়গাটাতেই!
আমি পুরো বিষয়টা আবার উপলব্ধি করার চেষ্টা করলাম। আল্লাহ বলতে চাইছেন কী?
মানুষ মারা গেলে তাকে কবরে নিয়ে যাওয়া হয়, মাটিচাপা দেওয়া হয়। কিন্তু আল্লাহ বলছেন, তোমরা কবরে 'যিয়ারত' করতে যাও!
যিয়ারত তো মানুষ কিছুক্ষণের জন্য করে। স্থায়ীভাবে থাকার জন্য তো কেউ যিয়ারত করতে যায় না!
আমি সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনে তাফসির খুঁজতে শুরু করলাম। তাফসিরে ইবনে কাসিরসহ আরও কয়েকটি গ্রন্থ পড়লাম। তারপর আমার উপলব্ধিতে যা এলো, তা হলো:
কবরই মানুষের শেষ গন্তব্য নয়!
কবর যেন একটা 'ওয়েটিং রুম' বা 'ট্রানজিট লাউঞ্জ'।
যেমন, এয়ারপোর্টে মানুষ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পরবর্তী ফ্লাইটে ওঠার জন্য, কবরও তেমনই পরবর্তী জীবনের একটি পর্যায়। আর আমরা বোকা মানুষরা দুনিয়াতে বসে ভাবি, এই বুঝি সব শেষ!
এরপর আমি প্রথম আয়াতের 'তাকাসুর' (التكاثر) শব্দটির তাফসির পড়লাম।
আল্লাহ এখানে শুধু বলেননি যে, 'টাকা তোমাদের ভুলিয়ে রেখেছে।' আল্লাহ বলেছেন, 'তাকাসুর' তোমাদের ভুলিয়ে রেখেছে।
তাকাসুর মানে কী?
তাকাসুরের মধ্যে রয়েছে বেশি পাওয়ার, সংখ্যায় বা সম্পদে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা।
সহজ ভাষায় বললে, এর মানসিকতা হলো, "ওর চেয়ে আমার বেশি লাগবে!"
এটা কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর নাম নয়। এটা একটা মানসিকতা, একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আর এই মানসিকতার কারণে আমাদের জীবনে অসন্তুষ্টি ও অস্থিরতা দিন দিন বাড়ছে।
আমার একটা ফোন আছে। কিন্তু বন্ধুর আইফোন প্রো ম্যাক্স দেখলে আমারও ওটা লাগবে।
আমার একটা ডিগ্রি আছে। কিন্তু অন্যের আরও ভালো ডিগ্রি দেখলে আমারও সেটা লাগবে।
ব্যাংকে টাকা আছে। কিন্তু আরেকজনের বেশি টাকা থাকলে আমার আরও বেশি লাগবে।
ক্যারিয়ার, স্ট্যাটাস, স্যালারি, সামাজিক অবস্থান—এই 'আরও চাই, আরও চাই' করতে করতে আমরা জীবনের আসল ফোকাসটাই হারিয়ে ফেলি।
সূরার শুরুতেই একটি মনস্তাত্ত্বিক সতর্কবার্তা
এই সূরার শুরুতেই আল্লাহ আমাদের এমন একটি মানসিকতার ব্যাপারে সতর্ক করছেন, যা মানুষকে নিজের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
একটি পশু সাধারণত তার প্রয়োজন মেটানোর জন্য খাবার খোঁজে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অনেক সময় ভিন্ন হয়ে যায়। নিজের প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পরও সে আরও বেশি জমাতে চায়, কারণ তার চাওয়া শুধু প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় সে অন্যের চেয়ে নিজেকে বড় প্রমাণ করতে চায়।
এটাই তাকাসুরের ভয়ংকর দিক!
এটা শুধু সম্পদের প্রতিযোগিতা নয়, এটা আমাদের অস্তিত্বের গভীর এক সংকট।
আমি যতই বিষয়টির গভীরে যাচ্ছিলাম, ততই অবাক হচ্ছিলাম।
'আলহাকুম' শব্দের গভীরতা
তাফসিরের আলোচনায় 'আলহাকুম' শব্দটি আমাকে আরও ভাবিয়ে তুলল।
এই শব্দের অর্থ হলো, কোনো কিছু তোমাকে এমনভাবে ব্যস্ত ও মগ্ন করে রেখেছে যে, তুমি তোমার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা ভুলে যাচ্ছ।
ধরুন, আগামীকাল আপনার ফাইনাল পরীক্ষা কিংবা বিশাল কোনো প্রেজেন্টেশন। অথচ আপনি আজ রাতে বসে নেটফ্লিক্সে সিরিজ দেখছেন।
এই সিরিজ দেখাটা তখন আপনার জরুরি দায়িত্ব থেকে আপনাকে গাফেল করে রাখছে।
ঠিক তেমনিভাবে, দুনিয়ার ক্যারিয়ার, ব্যাংক ব্যালেন্স, সামাজিক মর্যাদা আর 'সেটেল' হওয়ার চিন্তা করতে করতে আমরা আখিরাতের কথা ভুলে যাচ্ছি।
আমরা দুনিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, আখিরাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময়টুকুও যেন আমাদের নেই!
দুনিয়ার জীবন গুছিয়ে নিতে গিয়ে আমরা পরকালের প্রস্তুতির কথাই ভুলে যাচ্ছি।
সবচেয়ে ভয়ংকর সতর্কবার্তা
এরপর আসে এমন কিছু আয়াত, যা মানুষকে তার পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
আল্লাহ বলেন,
"কখনোই নয়! শিগগিরই তোমরা জানতে পারবে।"
(সূরা আত-তাকাসুর: ৩)
আর সূরার শেষ আয়াতে বলা হয়েছে,
"তারপর অবশ্যই সেদিন তোমাদের নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।"
(সূরা আত-তাকাসুর: ৮)
এখানে আল্লাহ আমাদের শুধু অভিযুক্ত করছেন না, বরং আমাদের বাস্তবতা ও পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।
আমরা মনে করি, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমাদের টাকা নেই, ভালো চাকরি নেই, অমুক জিনিসটা নেই, তমুক সুযোগটা নেই।
কিন্তু এই সূরার শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে ভাবলে একটি উপলব্ধি সামনে আসে:
"তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু তোমার অভাব নয়। তোমার সমস্যা হলো, তুমি এমন এক প্রতিযোগিতায় ছুটে চলেছ, যার কোনো শেষ নেই। তুমি এমন একটি গন্তব্যের জন্য সবকিছু জড়ো করছ, যেখানে তুমি স্থায়ীভাবে থাকবেই না!"
বর্তমান জীবনের দিকে তাকান
১. মানুষ আরও বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় অন্ধ হয়ে দৌড়াচ্ছে।
২. এই দৌড়ে সে নিজের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যাচ্ছে।
৩. দৌড়াতে দৌড়াতে একদিন হঠাৎ তাকে কবরে পৌঁছাতে হচ্ছে।
৪. মৃত্যুর পর তার সামনে বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে, কিন্তু দুনিয়ায় ফিরে এসে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ আর থাকবে না।
৫. শেষ পর্যন্ত তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের হিসাব দিতে হবে।
আমরা কেন আমাদের রবকে ভুলে যাই?
কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক যেন আগে থেকেই হাজারো চিন্তায় ব্যস্ত।
আমরা সারাদিন হিসাব করি, কীভাবে আরও দুই টাকা বেশি কামানো যায়, কীভাবে সিভিটা আরও ভারী করা যায়, কীভাবে অন্যের চেয়ে একটু ভালো জীবনযাপন করা যায়, কীভাবে আরও বেশি রোগী পাওয়া যায়।
এমনকি অনেক সময় নিজেদের লক্ষ্য পূরণের জন্য আমরা বিভিন্ন ফাঁকফোকর খুঁজতে থাকি, কখনো কখনো নিজেরাই নতুন ফাঁকফোকর তৈরি করি।
এই ইঁদুরদৌড়ে আমরা আমাদের যৌবন শেষ করে দিই। পরিবারকে সময় দিই না, নিজের আত্মার যত্ন নিই না, রবের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার জন্য সময় বের করতে পারি না।
অথচ সমস্যাটা এই নয় যে, মানুষ পরিশ্রম করছে।
ইসলাম তো পরিশ্রম করতে, হালাল উপার্জন করতে এবং দায়িত্ব পালন করতে উৎসাহিত করে।
সমস্যা হলো, আমরা কখনো কখনো ভুল উদ্দেশ্যে দৌড়াই, ভুল জিনিসকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বানিয়ে ফেলি।
বিষয়টা এমন:
আপনি রাজশাহী যাওয়ার টিকিট কেটেছেন, কিন্তু ভুল করে উঠে পড়েছেন সিলেটগামী ট্রেনে।
এখন সেই ট্রেনের এসি বগিতে বসে আপনি যতই আরাম অনুভব করেন না কেন, আপনি তো আপনার আসল গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন না!
ঠিক তেমনিভাবে, দুনিয়াতে আপনি যতই অর্থবিত্ত, সামাজিক মর্যাদা, ক্যারিয়ার আর বিলাসিতা অর্জন করুন না কেন, যদি জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যটাই ভুলে যান, তাহলে সেই অর্জনগুলো আপনাকে কাঙ্ক্ষিত পরিণতিতে পৌঁছে দিতে পারবে কি?
সবচেয়ে বড় ভয়টা এখানেই!
সারা জীবন আমরা যে স্ট্যাটাস, যে টাকা, যে ক্যারিয়ারের জন্য দৌড়ালাম, মৃত্যুর পর সেগুলোর অনেক কিছুই আমাদের সঙ্গে কবরে যাবে না।
যে সম্পদ নিয়ে এত অহংকার, যে পদমর্যাদা নিয়ে এত গর্ব, যে সামাজিক অবস্থান ধরে রাখতে এত প্রতিযোগিতা, সেগুলো দুনিয়াতেই পড়ে থাকবে।
আমাদের সঙ্গে থাকবে না সেই ফোন, সেই গাড়ি, সেই বাড়ি কিংবা সেই পদমর্যাদা।
থেকে যাবে আমাদের কাজ, দায়িত্ব, মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ এবং আল্লাহর কাছে আমাদের জবাবদিহি।
সেদিন আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হবে, আল্লাহ আমাদের যে সময়, শক্তি, সামর্থ্য ও নিয়ামত দিয়েছিলেন, সেগুলো আমরা কীভাবে ব্যবহার করেছি।
সূরা তাকাসুরের শেষ আয়াতটি তাই আমাদের জন্য গভীর এক সতর্কবার্তা:
আমরা যে নিয়ামতগুলো ভোগ করছি, সেগুলোর জন্যও একদিন জবাবদিহি করতে হবে।
আমরা সারা জীবন 'সেটেল' হওয়ার স্বপ্ন দেখি
একটা ভালো চাকরি হলে সেটেল হব।
আরও কিছু টাকা জমলে সেটেল হব।
একটা বাড়ি হলে, একটা গাড়ি হলে, আরও একটু সামাজিক মর্যাদা পেলে, তারপর হয়তো শান্তিতে থাকব।
কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের চাওয়ার যেন কোনো শেষ নেই।
একটা অর্জনের পর আরেকটা অর্জনের নেশা শুরু হয়। একটা লক্ষ্য পূরণ হলে আরেকটা লক্ষ্য সামনে এসে দাঁড়ায়।
এভাবে জীবন কেটে যায়, অথচ নিজের জীবনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবার সময়ই যেন পাওয়া যায় না।
সূরা তাকাসুর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার এই প্রতিযোগিতার কোনো শেষ নেই। মৃত্যুই একদিন সেই দৌড় থামিয়ে দেবে।
তাই প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে, জীবনে আমি কতটুকু অর্জন করলাম।
প্রশ্নটা হলো, অর্জনের এই দৌড়ে আমি আমার রবকে কতটা স্মরণ করেছি? তাঁর দেওয়া নিয়ামতগুলো কতটা সঠিকভাবে ব্যবহার করেছি? আখিরাতের জন্য কতটুকু প্রস্তুতি নিয়েছি?
কারণ, জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে যেন উপলব্ধি করতে না হয় যে, পৃথিবীর সবকিছু অর্জন করতে গিয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটাই করতে ভুলে গেছি!