08/10/2026
।। অক্ষরা রাত্রি ।। (১)
বিশ্বজননীর শ্রী শ্রী চণ্ডীর প্রথম চরিত্র হোলেন, মহাকালী— ইনিই রাত্রি নামে পরিচিতা। ভগবতী কালিকা সংসার বিনাশ করেন ও জীবের মুক্তি দান করেন।
🪷 বেদে রাত্রি দেবী হলেন শিবা, শুভগা, সকলের আশ্রয় স্থল, শত্রুনাশিনী-
🔴 আ রাত্রি পার্থিবং রজঃ পিতুরাপ্ৰায়ি ধামভিঃ।।
দিবঃ সদাংসি বৃহতী বি তিষ্ঠস আ ত্বেষং বর্ততে তমঃ... (১)
🟡 হে রাত্রি! তুমি তোমার অন্ধকারের দ্বারা পৃথিবী লোক এবং পিতৃগণের লোক স্বর্গকে পূর্ণ করেছ। মহান রাত্রি দ্যুলোকের স্থানসমূহকে বিশেষভাবে ব্যাপ্ত করে। নীল বর্ণের অন্ধকার সকলকে আবৃত করে।
🔴 ন যস্যাঃ পারং দদৃশে ন যোযুবদ্ বিশ্বমস্যাং নি বিশতে যদেজতি।
অরিষ্টা সস্ত উর্বি তমস্বতি রাত্রি পারমশীমহি ভদ্র পারমশীমহি।। (২)
🟡 রাত্রির কোনো শেষ দেখা যায় না। লোকব্যাাপিনী রাত্রিতে চরাচর বিশ্ব একাকার হয়ে যায়। হে কল্যাণী, বিশাল ও তমোময়ী রাত্রি! আমরা যেন কোনো ক্ষতি না হয়ে তোমার অপর পারে (প্রভাতে) পৌঁছাতে পারি। ~ অথর্ববেদ, সূক্ত- ৪৭, অধ্যায়- ১৯
🔴 অতি বিশ্বান্যরুহদ্ গম্ভীড়ো বর্ষিষ্ঠমরুহন্ত শ্রবিষ্ঠাঃ।
উশতী রাত্র্যনু সা ভদ্রাভি তিষ্ঠতে মিত্র ইব স্বধাভিঃ...(২)
🟡 যাতে প্রবেশ করা কঠিন, সেই রাত্রি সমস্ত চরাচর বস্তুকে আবৃত করে বিরাজমান। অন্নপূর্ণা এই রাত্রির সকলে স্তুতি করে। সূর্য যেমন স্বীয় তেজে বিশ্বকে ব্যাপ্ত করেন, তেমনই এই রাত্রি বন, পর্বত, সাগর ইত্যাদিকে আবৃত করে জগৎ জুড়ে ছেয়ে যায়।
🔴 বর্যং বন্দে সুভগ সন্ধানং রাত্রি সুমনা ইহ স্যাম।
অস্মাংস্ত্রায়স্ব নর্যাণি জাতা অথো যানি গব্যাণি পুষ্ট্যা... (৩)
🟡 হে অনিরুদ্ধ প্রভাবশালিনী, প্রশংসিতা ও সৌভাগ্যবতী রাত্রি! তুমি আগমন করেছ। তোমার আগমনে আমি যেন প্রসন্নচিত্ত হই। আমাদের পালন করো এবং উৎপন্ন বস্তুকে, মানুষের কল্যাণকারী বিষয়কে ও পুষ্টিদাত্রী গাভীসমূহকে রক্ষা করো।
🔴 শিবাং রাত্রিমনুসূর্যং চ হিমস্য মাতা সুহবা নো অস্তু।
অস্য স্তোমস্য সুভগে নি বোধ যেন ত্বা বন্দে বিশ্বাসু দিক্ষু... (৫)
🟡 হে রাত্রি! আমি কল্যাণময়ী তোমার বন্দনা করি, সূর্যের পরবর্তীকালে তুমি প্রকট হও। তুষারের মাতা রাত্রি আমাদের জন্য সুসংবাদ আনুক। হে ভাগ্যবতী রাত্রি! আমাদের কৃত স্তোত্র গ্রহণ করো, যার মাধ্যমে আমরা সর্বদিকে তোমার বন্দনা করি।
🔴 যো অদ্য স্তেন আয়ত্যাগায়ুর্মর্ত্যো রিপুঃ।
রাত্রী তস্য প্রতীত্য প্র গ্রীবাঃ প্র শিরো হনৎ... (৯)
🟡 এই সময়ে যে চোর, হিংসুক ও মরণধর্মী শত্রু আগমন করছে, হে সুন্দর রূপবর্তী রাত্রি! আমার সমীপবর্তী সেই শত্রুর কাছে গিয়ে তার জিভ ও মাথা কেটে ফেলো।
🔴 প্রপাদৌ ন যথায়তি প্র হস্তৌ ন যথাশিষৎ।
যো মলিম্লুরুপায়তি স সংপিষ্টো অপায়তু।
অপায়তু স্বপ্নায়তু শুষ্কে স্থাণাবপায়তু... (১০)
🟡 হে রাত্রি! তুমি আমার শত্রুর পা এমনভাবে কেটে দাও যাতে সে পুনরায় আসতে না পারে। তার হাত এমনভাবে কেটে দাও যাতে সে আমাকে আলিঙ্গন করতে না পারে। যে চোর আমার কাছে আসে, তাকে চূর্ণ করে দূরে পাঠিয়ে দাও। সে যেন শুকনো কাঠের খুঁটিকে আশ্রয় করে দূরে চলে যায়।
~ওই, সূক্ত- ৪৯
🪷 এরপর বিভিন্ন গৃহ্য সূত্রে দেবীর নাম পাওয়া যায় যেমন- কালরাত্রি, মহাকালী, ভদ্রকালী, কালী, মহাকালরাত্রী, ইত্যাদী। আবার সামবেদীয় ব্রাহ্মণে রাত্রি পাশ হস্তা ময়ূর পুচ্ছের দ্বারা কেশ বন্ধনকারিণী এক যুবতী কুমারী— যিনি সকলের মোক্ষ দান করেন।
🪷 রাত্রির ভাবনা বৈদিক যুগের নয়, বরং তিনি অনার্য সমাজের সেই চিরন্তনী মৃত্যুরূপা এক করালচরিত্রা দেবী, যাকে বেদ ভিত ও সন্ত্রস্ত হয়েই ঊষা, সুর্য, জ্যোতির্ময়ী শিবার সাথে জড়িয়ে স্তুতি করেছেন। দেবীমাহাত্ম্য এই দুই সূত্রকেই এক কোরে দিয়েছে, এই অনার্য তথা অবৈদিক রাত্রি আমাদেরই চিরপরিচিতা কালী।
🪷 কৌল সম্রাট অভিনব গুপ্ত বলছেন-
ইত্যুক্তম্, তত্র কিমন্যত তিষ্ঠতীত্যাশঙ্ক্য আগমম্ পঠতি 'পরাৎ' ইতি। 'পরমেষ্ঠিনঃ' ইতি ব্যাখ্যায় 'সারতয়া' ইতি সূত্রে যদনুবাদনম্ হেতু তয়া হৃদয়ত্বে সাধ্যে, তত্ ব্যাচষ্টে 'যথা' ইতি। 'চেতনম্ প্রতিষ্ঠা' ইতি সম্বন্ধঃ, 'চেতনাবতামপি' ইতি 'যথা' ইতি সম্বন্ধঃ। তথোক্তম্—
সাক্ষাত্ কিত্স্নমিসম্ দেহম্ যদ্যাপি ব্যাপ্য তিষ্ঠতি।
তথাপ্যস্য পরম্ স্থানম্ হৃদ্পঙ্কজসমুদগকম্॥
ইত্যাদি। প্রকৃতে যোজয়তি 'তথৈব' ইতি। 'বিশ্বচেতনস্য' ইতি ভগবতঃ পরমশিবস্য ইত্যর্থঃ। সা পরা বিমর্শশক্তিঃ পরমেশ্বরস্য প্রতিষ্ঠা ইত্যনেন শব্দেন পরমেশ্বরস্য হৃদয়ম্ ইত্যনেন চ শব্দেন বাচ্যা।
এইরূপ বর্ণনার পর, "এখানে আর কী অবশিষ্ট থাকে?"—এই আশঙ্কা প্রকাশ করিয়া আগম শাস্ত্রকে উদ্ধৃত করা হইয়াছে: "পরাৎ..."। 'পারমেষ্ঠিনঃ'-এর ব্যাখ্যা প্রদানপূর্বক এবং 'সারতয়া' সূত্রে যাহা বলা হইয়াছে, তাহাকে সংবিৎ বা চেতনার 'হৃদয়ত্ব' প্রমাণের হেতু হিসাবে ব্যাখ্যাকালীন 'যথা' পদের প্রয়োগ করা হইয়াছে। ইহার সম্বন্ধ হইল: "চেতনা-ই প্রতিষ্ঠা (ভিত্তি)"। চৈতন্যময় সত্তাসমূহের ক্ষেত্রেও ইহার সম্বন্ধ 'যথা' পদের ন্যায়। যেমন বলা হইয়াছে—
"যদিও তিনি এই সমগ্র দেহে প্রত্যক্ষভাবে ব্যাপ্ত হইয়া অবস্থান করেন, তথাপি তাঁহার পরম বা শ্রেষ্ঠ স্থান হইল হৃদয়ে অবস্থিত পদ্মকোরক (হৃদ্পঙ্কজ-সমুদ্গক)।"
মূল প্রসঙ্গে ইহা যুক্ত করিয়া বলা হইতেছে: "ঠিক তেমনই" (তথৈব)। "বিশ্বচেতনস্য" বলিতে ভগবান পরমশিবের কথা বুঝানো হইয়াছে। সেই পরা বিমর্শশক্তি-কেই শিবের 'প্রতিষ্ঠা' এবং পরমেশ্বরের 'হৃদয়' শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়।
'তস্যাশ্চ' ইতি পরমশিবরূপায়াঃ। 'অস্যাঃ' ইতি সর্বত্র বিজৃম্ভমাণায়াঃ। 'সৈব' ইতি যা এব স্বাতন্ত্র্যপ্রসরাদিশা বাহ্যপর্যন্তবিমর্শরূপা। 'এষা' ইতি অখিলপ্রকাশঅনুগ্রাহিণী। 'পূর্বিকা' ইতি ইচ্ছা দিশক্ত্যন্তরকক্ষ্যাম্—
তাবদ্গৃহ্ণাতি। 'কর্তৃতা এব' ইতি অ স্বাতন্ত্র্যলেশঃ যস্যাঃ ন কশ্চিত্। 'চিতিমাত্ররূপা' ইতি এতদেব চেতনত্বম্ যতঃ।
'পরস্বাতন্ত্র্যরূপম্' অস্যা ব্যাচষ্টে 'শোধিতা' ইতি। অপরদশায়াম্ ভিন্নম্, পরাপরদশায়ামভিন্নম্ ইতি উভয়থাপি যত্ বেদ্যকার্যরূপম্ বস্তু, তত্ অস্যাম্ স্বাতন্ত্র্যশক্তৌ প্রত্যস্তমিতম্ চ প্রত্যুজ্জীবনযোগ্যম্ চ, প্রত্যুজ্জীবিতম্ চ অক্রমমেব আস্তে ইতি। সেয়ম্ সপ্তত্রিংশী তত্ত্বকলা শুদ্ধষট্ ত্রিংশ্যাঃ পরম্ তত্ত্বম্ ইতি সম্বন্ধঃ।
ইয়ত্ সা রত্নম্ নির্ণীতম্ যত্ বিতত্য শ্রীবিষমদর্শনসারশাস্ত্রে নিরূপিতম্ শক্তিলক্ষণেন। ইয়তা সৌত্রম্ সারপদম্ অনুবাদমুখেন বিধিরপি ইতি ব্যাখ্যাতম্। 'পরমেষ্ঠিনঃ' ইতি ব্যাচষ্টে—
'পরমে পদে' ইতি সপ্তত্রিংশদ্রূপে। তথোক্তম্—
যোগপীঠসংস্থিতায়াঃ...
ইতি মন্ত্রতত্ত্বম্ ব্যাখ্যাতুম্ ভগবতা—
যোগোঽস্য শক্তয়ঃ স্বাক্যা... (মা০ বি০ ৪।৫)
ইতি, অন্যত্রাপি—
সা পরা পরমা দেবী যোগে ভৈরবযামলে॥
'তস্যাশ্চ' (এবং তাঁহার)— যিনি পরমশিবরূপা। 'অস্যাঃ' (ইঁহার)— যিনি সর্বত্র বিজৃম্ভিত বা প্রস্ফুটিত হইয়া আছেন। 'সৈব' (তিনিই)— যিনি স্বাতন্ত্র্যের প্রসার ইত্যাদির মাধ্যমে বাহ্য রূপ পর্যন্ত বিमर्श স্বরূপা। 'এষা' (ইনি)— যিনি নিখিল প্রকাশকে অনুগ্রহ দান করেন। 'পূর্বিকা' (পূর্ববর্তিনী)— যিনি ইচ্ছা ইত্যাদি অপরা শক্তির অভ্যন্তরীণ কক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন।
'কর্তৃতাই'— যাহার মধ্যে পরাধীনতার লেশমাত্রও নাই। 'চিতিমাত্ররূপা'— কারণ ইহাই মূল সচেতনতা (চেতনত্ব)।
তাঁহার 'পর-স্বাতন্ত্র্য রূপের' ব্যাখ্যা দিয়া বলা হইয়াছে— 'শোাধিতা'। অপরা দশায় ভিন্ন এবং পরাপরা দশায় অভিন্ন— উভয় রূপেই যাহা জ্ঞাতব্য বা কার্যরূপ বস্তু, তাহা এই স্বাতন্ত্র্যশক্তিতে বিলীন হয়, পুনরুজ্জীবিত হওয়ার যোগ্য হয় এবং ক্রমহীনভাবেই (একই সাথে) পুনরুজ্জীবিত হইয়া অবস্থান করে। অতএব, এই ৩৭তম তত্ত্বকলা (সপ্তত্রিংশী তত্ত্ব) হইল শুদ্ধ ৩৬টি তত্ত্বের অতীত পরম তত্ত্ব।
ইহা সেই পরম রত্ন রূপে নির্ণীত হইয়াছে, যাহা 'শ্রীবিষমদর্শনসারশাস্ত্র'-এ বিস্তৃতভাবে শক্তির লক্ষণ দ্বারা নিরূপণ করা হইয়াছে। সূত্রীয় মূল পদ অনুবাদ ও বিধির মাধ্যমে এইরূপে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। 'পারমেষ্ঠিনঃ' পদের ব্যাখ্যায় বলা হইয়াছে—
'পরম পদে'— অর্থাৎ ৩৭তম তত্ত্বরূপে। যেমন বলা হইয়াছে— "যোগপীঠসংস্থিতা..."।
মন্ত্ৰতত্ত্ব ব্যাখ্যা করিবার উদ্দেশ্যে ভগবান বলিয়াছেন: "যোগোঽস্য শক্তয়ঃ স্বাক্যা..." (মালিনীবিজয়োত্তর তন্ত্র ৪.৫)। অন্যত্রও বলা হইয়াছে— "তিনিই পরম যোগে পরমেশ্বরী পরা দেবী ভৈরবযামল..."। ~[ঈশ্বরপ্রত্যাভিজ্ঞা টীকা অভিনব গুপ্ত]
🪷 অর্থাৎ এই দেবীই পরা অবস্থায় ৩৭ তত্ত্বে স্থিতা, ইচ্ছাদী পঞ্চশক্তির ঊর্ধ্বে ও সম্পূর্ন স্বাতন্ত্র্যবলে ৩৬ তত্ত্বে রূপান্তরিত হন। এখন দেবীকেই শিবের উদ্দেশ্যে গমণকারিণী মুখ বা প্রবেশ বলা হয়েছে, এবং অদ্বিতীয়া দেবীই সাধককে নিজেরই শিব দশার সহিত মিলন ঘটান, যেমন তন্ত্রালোকে বলা হয়েছে-
ইত্যাশঙ্ক্যাহ— ইত্থম্ দ্বাদশধা সংবিচ্ছন্তী বিশ্বমাতৃষু॥ ১৯৮॥
একৈবেতি ন কাস্যাঃ ক্রমস্য নিয়মঃ ক্বচিত্।
ক্রমাভাবান্ন যুগপত্তদভাবাত্ ক্রমোঽপি ন॥ ১৯৯॥
ক্রমাক্রমকথাতীতং সং ভিত্তত্ত্বং সুনির্মলম্।
চ নীলাদ্যর্থবিশেষং স্বাপেক্ষয়া যুগপত্ দ্বাবেন
অভিমন্যতে, ইতি তস্যৈব ক্রমযৌগপদ্যা অবভাসঃ,
যদুক্তম্—
'সর্বত্রাভাসভেদো হি ভ্বেত্ কালক্রমা করঃ।
বিচ্ছিন্নাভাবাসঃ শুন্যাদের্মাতৃভাত্স্য নো সকল্॥' ইতি॥ ১৯৮-১৯৯॥
ননু যদি এবম্ তদস্যাঃ পরস্যাঃ সংবিদঃ কথম্
নামাবাহনবিকার্জনাদ্যাত্মকত্বাত্ ক্রমানুপ্রাণিতা পূজা
ভ্বেত্? ইত্যাশঙ্ক্যাহ—
তদস্যাঃ সংবিদো দেব্যা যত্র ক্বাপি প্রবর্তনম্॥ ১৮০॥
তাদাত্ম্যযোগেন পূজা পূর্ণৈব বর্ততে। তত্র—
যত্র ক্বচন সংবিদবষ্টম্ভেনবস্থানং নাম মুখ্যা পূজা, ন
পুনরাবাহনাদিরূপইতি তাৎপৰ্য্যার্থঃ, যদুক্তম্—
'যস্মিন্ যস্মিংশ্চক্রবরে তত্স্পর্শাহ্লাদনিবৃ তিঃ।
তদবষ্টম্ভযোগো যঃ স হি পূজা বিধিঃ স্মৃতঃ॥' ইতি॥ ১৮০॥
"যদিও এই সংবিৎ (পরম চেতনা) বিশ্বমাতৃকাগণের মধ্যে ১২টি রূপে বিরাজিত, তথাপি প্রকৃতপক্ষে তিনি 'একই'। এখানে ক্রমের (পর্যায়ের) কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নাই। যেহেতু প্রকৃত অর্থে কোনো ক্রম নাই, তাই ইহা 'যুগপৎ' (একই সাথে ঘটে এমন) নয়; আবার যুগপৎ না হওয়ায় ইহাকে পৃথক 'ক্রম' বলাও চলে না। বস্তুত, এই সুনির্মল পরম সংবিৎ-তত্ত্ব ক্রম ও অক্রমের সমস্ত আলোচনার অতীত।"
"নীল ইত্যাদি বাহ্য বিষয়সমূহ নিজের অপেক্ষায় যুগপৎ ভাসমান বলিয়া মনে হয়, ইহা কেবল সেই পরম চেতনার ক্রম ও যুগপৎ অবভাস (প্রকাশ) মাত্র। যেমন বলা হইয়াছে—
'সর্বত্র ভাসমান অবভাস বা রূপের ভেদই কালক্রমের মূল কারণ। শূন্য প্রভৃতির বিচ্ছিন্ন অবভাস প্রমাথার প্রকাশের দ্বারা একবারে ঘটে না।'"
"প্রশ্ন উঠে: যদি এমনই হয়, তবে এই পরা সংবিৎ-দেবীর আবাহন, বিসর্জন ইত্যাদি কায়িক বা ক্রমানুসারী পূজা কীভাবে সম্ভব?
এই শঙ্কার উত্তরে বলা হইয়াছে:
এই সংবিৎ দেবীর পূজা যেখানেই তাড়াত্ম্য বা অভেদ যোগের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানেই তাহা 'পূর্ণ পূজা' রূপে বিরাজ করে। সেখানে সংবিদের অবষ্টম্ভে (পরম চেতনায় স্থির হইয়া) অবস্থান করাই প্রধান পূজা, বাহ্যিক আবাহন বা বিসর্জন নয়। যেমনতন্ত্রালোকে (আহ্নিক ৪) বলা হইয়াছে—
'যে যে শ্রেষ্ঠ চক্রে তাঁহার স্পর্শজনিত আহ্লাদ ও শান্তি প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহাতেই সংবিদের স্থিতিলাভ করার যোগই প্রকৃত পূজাবিধি বলিয়া স্মৃত।' "
🪷 আবার তাঁরই শিষ্য, ক্ষেমরাজ বিজ্ঞান ভৈরবের টীকায় বলেন এই পরাশক্তি স্বয়ং নির্বিকল্পা অদ্বৈতপদে স্থিতা, এবং স্বয়ং প্রশ্ন ও উত্তর রূপে স্পন্দিতা হন। ভৈরবের পরম নিস্কল রূপ এই পরাদেবীই আবার শিবের উদ্দেশ্যে গমন করার পথ, উক্ত তন্ত্রে বলা হচ্ছে-
বর্ণস্য সবিসর্গস্য
বিসর্গান্তং চিতিং কুরু ।
নিরাধারেণ চিত্তেন
স্পৃশেদ্ব্রহ্ম সনাতনম্ ॥ ৯১ ॥
দিগ্দিগন্তের সীমারহিত আকাশতুল্য সর্বব্যাপী রূপে নিজ আত্মাকে ধ্যান করবে। তখন আশ্রয়হীন পরম চিতি শক্তি নিজের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত করবেন। ॥ ৯২ ॥
🪷 দেবীকে অভিনব গুপ্ত তাঁর পরাত্রিশিকায় বলেছেন যে অনুত্তরা স্বয়ংপ্রকাশ্যা মাতৃকা শক্তিরূপে অ থেকে ক্ষ পর্যন্ত সর্ব তত্ত্বের জননী— বিশ্বতীর্ণা হয়েও দেবী বিশ্বময়ী। দেবী মাহাত্ম্যে তাই ব্রহ্মা বলেছেন-
ত্বং স্বাহা ত্বং স্বধা ত্বং হি বষট্কারঃ স্বরাত্মিকা ।
সুধা ত্বমক্ষরে নিত্যৈ ত্রিধা মাত্রাত্মিকা স্থিতা ॥ ১ ॥
অর্ধমাত্রা স্থিতা নিত্যা যা অনুচ্চার্যা বিশেষতঃ ।
ত্বমেব সন্ধ্যা সাবিত্রী ত্বং দেবী জননী পরা ॥ ২ ॥
হে দেবি! তুমিই স্বাহা, তুমিই স্বধা, তুমিই বষট্কার এবং তুমিই স্বরাত্মিকা (স্বরের আত্মাস্বরূপা)। তুমিই নিত্য অক্ষয় অমৃত (সুধা)। তুমি ওংকার-রূপী অ, উ, ম—এই তিন মাত্রায় স্থিতা। ॥ ১ ॥
তুমি নিত্য অর্ধমাত্রা, যা বিশেষ করে প্রপঞ্চের অগতি ও অনির্বচনীয়। তুমিই সন্ধ্যা, তুমিই গায়ত্রী/সাবিত্রী এবং তুমিই পরম বিশ্বজননী। ॥ ২ ॥