19/08/2026
কয়েকদিন আগে আমার চেম্বারে এক দম্পতি এসেছিলেন Couple Counselling-এর জন্য। বেশ কয়েক বছর ধরে তাঁদের দাম্পত্য জীবন চলছিল। বাইরে থেকে তাঁদের সম্পর্কটাকে খুব সুন্দরই মনে হতো। দুজনেই নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেন, ছুটির দিনে একসঙ্গে সময় কাটান। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে তাঁদের মধ্যে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন, হয়তো কাজের চাপের কারণেই এমন হচ্ছে। কিন্তু সময় যত যেতে থাকে, ছোট ছোট বিষয় নিয়েই তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। স্ত্রী অভিযোগ করছিলেন, স্বামী তাঁর সঙ্গে আগের মতো কথা বলেন না। স্বামী আবার বলছিলেন, তিনি তো সংসারের জন্য সবকিছু করছেন, তাহলে স্ত্রী কেন বারবার বলছেন যে তিনি একা হয়ে যাচ্ছেন?
কথা বলতে বলতে একটা ঘটনা সামনে এল।
একদিন স্ত্রী অফিস থেকে খুব ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। সেদিন তাঁর কর্মক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমস্যা হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন স্বামীকে ঘটনাটা বলতে। কিন্তু স্বামী তখন নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি শুধু বলেছিলেন, এখন খুব ক্লান্ত, পরে কথা বলব।
স্বামীর কাছে কথাটা ছিল একেবারেই সাধারণ। তাঁর মনে হয়েছিল, একটু পরে সময় করে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু স্ত্রীর কাছে সেই মুহূর্তটা ছিল অন্যরকম। তিনি মনে করেছিলেন, আমি যখন সবচেয়ে বেশি তোমাকে প্রয়োজন করছি, তখনও তুমি আমার জন্য সময় বের করলে না।
এরপর থেকে স্ত্রী ধীরে ধীরে নিজের সমস্যাগুলো বলা কমিয়ে দেন। স্বামীও বুঝতে পারেননি যে তাঁর নীরবতাকে স্ত্রী প্রত্যাখ্যান হিসেবে অনুভব করছেন। ফলে দুজনেই নিজেদের মতো করে কষ্ট পেতে থাকেন।
আমি তাঁদের বলেছিলাম, আপনাদের সমস্যাটা হয়তো ভালোবাসা নেই এমন নয়। বরং আপনাদের দুজনের ভালোবাসার ভাষা এবং emotional need আলাদা হয়ে গেছে।
একজন ভালোবাসা প্রকাশ করছেন দায়িত্ব নিয়ে, সংসারের কাজ করে, আর্থিক নিরাপত্তা দিয়ে। অন্যজন ভালোবাসা অনুভব করতে চাইছেন কথা, মনোযোগ এবং emotional availability-এর মাধ্যমে।
এখানেই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ psychological বিষয় কাজ করে। আমরা অনেক সময় ভাবি, আমি তো আমার সঙ্গীর জন্য এত কিছু করছি, তাহলে সে কেন বুঝছে না? কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু ভালোবাসা দেওয়া যথেষ্ট নয়, সেই ভালোবাসা সঙ্গী কীভাবে গ্রহণ করছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
আমি তাঁদের একটি ছোট exercise দিয়েছিলাম। প্রতিদিন রাতে মাত্র দশ মিনিট একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সেই দশ মিনিটে কোনও অভিযোগ করা যাবে না, কোনও সমস্যার সমাধানও করতে হবে না। শুধু বলতে হবে, আজ আমার দিনটা কেমন গেল এবং আজ তোমার কাছ থেকে আমি কী অনুভব করেছি। এর পর চলতে থাকে পরিবর্ত সেশন , তারাও ধৈর্য্য রেখে সবটা ফলো করে যান । অনেকেই আছেন মনে করেন একদিনেই তাদের 10 টা জিনিস বলে দেওয়া হবে কিন্তু ব্রেইন এরকম একসাথে অনেক কিছু ফলো করতে পারেনা অভ্যাস তৈরি করতে পারেনা , এটা অনেকে বোঝেন না, যারা বুঝতে পারেন তারা কিন্তু নিজেদের সম্পর্কের সমীকরণ সঠিক করতে সফল হন।
তারপর কিছুদিন পর তাঁরা আবার counselling-এ এলেন। তাঁদের মধ্যে আগের মতো উত্তেজনা ছিল না। স্ত্রী বললেন, এখন ও আমার কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত শোনে। স্বামী বললেন, আগে আমি ভাবতাম সমস্যার সমাধান করে দিলেই দায়িত্ব শেষ। এখন বুঝেছি, কখনও কখনও ও শুধু চায় আমি ওর পাশে থাকি।
আমি তাঁদের একটা কথাই বলেছিলাম, সম্পর্কের দূরত্ব সবসময় বড় কোনও ঘটনার কারণে তৈরি হয় না। অনেক সময় দূরত্ব তৈরি হয় সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতে, যখন একজন কথা বলতে চেয়েছিল কিন্তু অন্যজন শুনতে পারেনি, একজন কাছে আসতে চেয়েছিল কিন্তু অন্যজন বুঝতে পারেনি।
আর সম্পর্ককে আবার কাছে আনার শুরুটাও অনেক সময় খুব ছোট একটি জায়গা থেকেই হয়, আমি তোমার কথাটা শুনছি, তুমি বলো।
bonding